২০২৫: শোক, বিবর্তন এবং এক নতুন ইতিহাসের যাত্রা
উৎসব—এই শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক চিরন্তন আনন্দ, এক সাময়িক বিরতি আর নতুন করে বেঁচে ওঠার প্রেরণা। ভারত ও বাংলাদেশের মতো বহু-সাংস্কৃতিক দেশে, ধর্মীয় উৎসবগুলি শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক উদযাপন নয়; এগুলি আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত এক বৃহত্তর অর্থনৈতিক চক্র ও সামাজিক ঐক্যের চালিকাশক্তি। দুর্গাপূজা হোক বা ঈদ-উল-ফিতর, দেওয়ালি হোক বা বড়দিন—প্রতিটি উৎসবই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এক ইতিবাচক ঢেউ নিয়ে আসে, যেখানে ধর্মীয় গোঁড়ামির স্থান নেই, বরং প্রাধান্য পায় মানুষের কল্যাণ।
একটি ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে যে বিপুল আর্থিক লেনদেন ঘটে, তাকে ‘উৎসবের অর্থনীতি’ বলা যায়। এই অর্থনীতি ধর্ম বা জাতপাত চেনে না; এটি কেবল শ্রম, পরিষেবা এবং পণ্য বিনিময়ের ভিত্তিতে চলে। দুর্গাপূজার কথাই ধরা যাক। এই একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে সমাজের একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে উচ্চ স্তর পর্যন্ত একটি কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
উৎসবের সময় সবচেয়ে বেশি লাভবান হন সমাজের প্রান্তিক বা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষজন। এই সময়ে:
উৎসবের মাসগুলিতে ফ্যাশন, সৌন্দর্য, ক্যাটারিং, এবং আলোকসজ্জা শিল্পে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়।
উৎসব কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, এটি সামাজিক পুঁজি (Social Capital) তৈরিরও শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। উৎসবের মূল লক্ষ্য থাকে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, আর এই আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সময় ধর্মীয় ভেদাভেদ দূর হয়।
একটি উৎসব সফলভাবে আয়োজনের জন্য বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণির মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
নিয়মিত জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দিতে উৎসবের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষ কেনাকাটা করে, ঘুরে বেড়ায় এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে মিলিত হয়। এই মানসিক স্বস্তি এবং সম্পর্কের পুনর্নবীকরণ সমাজের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।
তাছাড়া, বড় উৎসবগুলি স্থানীয় পর্যটনকেও প্রভাবিত করে। বহিরাগতরা উৎসব দেখতে আসেন, যার ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও হস্তশিল্পের ব্যবসায় গতি আসে। এটি আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাজ্য পর্যটকদের কাছে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধর্মনিরপেক্ষ রূপটি তুলে ধরে।
ধর্মীয় উৎসবগুলি আমাদের সমাজের অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করে এবং মানবিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। এই উৎসবগুলি প্রমাণ করে যে, যখন প্রয়োজন হয়, তখন মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র প্রতিবেশী, ক্রেতা, বিক্রেতা বা সহকর্মী হিসেবে একে অপরের ওপর নির্ভর করে।
এখানকার মূল বার্তাটি হলো: উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে ধর্মীয় বিশ্বাস থাকলেও, এর পরিধি ও সুবিধা সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ও কল্যাণমুখী। উৎসবের সময় এক রিকশা চালকের বেড়ে যাওয়া রোজগার, এক দর্জির হাতে অতিরিক্ত কাজ, অথবা রাস্তার ধারে ফুচকা বিক্রেতার মুখে হাসি—এই প্রতিটি দৃশ্যই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ঐক্যের ফল।
আমাদের সকলের উচিত এই 'উৎসব অর্থনীতি'র গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং এটিকে একটি জাতীয় সম্পদ হিসেবে লালন করা, যা কেবল সংস্কৃতিকেই নয়, আমাদের সম্মিলিত জীবনযাত্রাকেও উন্নত করে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন