২০২৫: শোক, বিবর্তন এবং এক নতুন ইতিহাসের যাত্রা

ছবি
 ২০২৫: শোক, বিবর্তন এবং এক নতুন ইতিহাসের যাত্রা ২০২৫ সালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আবেগঘন বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একদিকে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও দুর্ঘটনা আমাদের ব্যথিত করেছে, অন্যদিকে দেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। আজকের প্রতিবেদনে আমরা ২০২৫ সালের সেই সব ঘটনা ও অঘটনগুলো তুলে ধরছি যা আমাদের জাতীয় জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ১. বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ: একটি যুগের অবসান ২০২৫ সালের শেষভাগে বাংলাদেশ হারিয়েছে তার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং আপসহীন নেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে।  * মহাপ্রয়াণ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর ৮০ বছর বয়সে তাঁর এই প্রস্থান দেশের রাজনীতিতে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে।  * রাষ্ট্রীয় শোক: তাঁর মৃত্যুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। এছাড়া ৩১ ডিসেম্বর সারাদেশে সাধারণ ছুটি পালন কর...

উৎসবের ধর্মনিরপেক্ষ অর্থনীতি: সমৃদ্ধি ও ঐক্যের মঞ্চ


 

উৎসবের ধর্মনিরপেক্ষ অর্থনীতি: সমৃদ্ধি ও ঐক্যের মঞ্চ

​উৎসব—এই শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক চিরন্তন আনন্দ, এক সাময়িক বিরতি আর নতুন করে বেঁচে ওঠার প্রেরণা। ভারত ও বাংলাদেশের মতো বহু-সাংস্কৃতিক দেশে, ধর্মীয় উৎসবগুলি শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক উদযাপন নয়; এগুলি আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত এক বৃহত্তর অর্থনৈতিক চক্র ও সামাজিক ঐক্যের চালিকাশক্তি। দুর্গাপূজা হোক বা ঈদ-উল-ফিতর, দেওয়ালি হোক বা বড়দিন—প্রতিটি উৎসবই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এক ইতিবাচক ঢেউ নিয়ে আসে, যেখানে ধর্মীয় গোঁড়ামির স্থান নেই, বরং প্রাধান্য পায় মানুষের কল্যাণ।

​উৎসবের অর্থনীতি: ধর্মীয় সীমা পেরিয়ে আয়ের স্রোত

​একটি ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে যে বিপুল আর্থিক লেনদেন ঘটে, তাকে ‘উৎসবের অর্থনীতি’ বলা যায়। এই অর্থনীতি ধর্ম বা জাতপাত চেনে না; এটি কেবল শ্রম, পরিষেবা এবং পণ্য বিনিময়ের ভিত্তিতে চলে। দুর্গাপূজার কথাই ধরা যাক। এই একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে সমাজের একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে উচ্চ স্তর পর্যন্ত একটি কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

​১. ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের আশীর্বাদ

​উৎসবের সময় সবচেয়ে বেশি লাভবান হন সমাজের প্রান্তিক বা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষজন। এই সময়ে:

  • রাস্তার বিক্রেতারা: ফুচকা, চানাচুর, বাদাম, এবং পানীয় বিক্রেতারা (যাঁরা মুসলিম বা হিন্দু—উভয় সম্প্রদায়েরই হতে পারেন) চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে তাঁদের বছরের একটি বড় অংশের আয় করে ফেলেন। তাঁদের দৈনন্দিন উপার্জনে এক বিশাল উল্লম্ফন দেখা যায়।
  • পরিবহন খাত: রিকশা, অটো, ট্যাক্সি, এবং ব্যক্তিগত গাড়ি চালকদের আয় বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। পূজা মণ্ডপে ভিড়, কেনাকাটার জন্য বাজারে যাতায়াত, বা ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরা—সব ক্ষেত্রেই পরিবহন ব্যবস্থা অপরিহার্য। এই চালকদের মধ্যে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সকল ধর্মীয় গোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন।
  • কারুশিল্পী ও কারিগর: দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপ সজ্জা, এবং প্যান্ডেলের কাঠামো তৈরি—এই সব কাজে হাজার হাজার শিল্পী ও শ্রমিক যুক্ত থাকেন। একইভাবে, ঈদের আগে পোশাক, জুতো ও চামড়াজাত পণ্য তৈরি এবং ক্রাফটিংয়ে বহু মানুষ কর্মসংস্থান পান। অনেক মুসলমান কারিগরই দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরি করেন, আবার অনেক হিন্দু দর্জি ঈদের পোশাক সেলাই করেন। এটিই উৎসব অর্থনীতির ধর্মনিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

​২. পরিষেবা ও সরবরাহ খাতে সচলতা

​উৎসবের মাসগুলিতে ফ্যাশন, সৌন্দর্য, ক্যাটারিং, এবং আলোকসজ্জা শিল্পে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়।

  • দর্জি ও বিউটি পার্লার: নতুন পোশাক তৈরি এবং সাজসজ্জার জন্য দর্জির দোকান ও পার্লারগুলিতে লম্বা লাইন দেখা যায়। এই পেশাগুলিও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে।
  • আলোকসজ্জা ও সজ্জাকর: পূজা মণ্ডপ বা ঈদের বাজার, সব ক্ষেত্রেই ঝলমলে আলোর ব্যবহার অপরিহার্য। এই কাজগুলি সাময়িক হলেও, বহু বেকার যুবককে কয়েক দিনের জন্য একটি সম্মানজনক আয়ের সুযোগ দেয়।

​সামাজিক পুঁজি ও ঐক্যের বন্ধন

​উৎসব কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, এটি সামাজিক পুঁজি (Social Capital) তৈরিরও শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। উৎসবের মূল লক্ষ্য থাকে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, আর এই আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সময় ধর্মীয় ভেদাভেদ দূর হয়।

​১. আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহযোগিতা

​একটি উৎসব সফলভাবে আয়োজনের জন্য বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণির মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

  • ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা: পূজা বা অন্য যেকোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য মণ্ডপ তৈরি বা বাজার প্রস্তুত করার সময় হিন্দু-মুসলিম যুবকেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। স্থানীয় ক্লাব বা কমিটিগুলিতে প্রায়শই সকল সম্প্রদায়ের সদস্যরা একসাথে অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে অতিথিদের আপ্যায়ন পর্যন্ত সব কাজ পরিচালনা করেন। এই যৌথ শ্রম মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া ও নির্ভরতা বাড়ায়।
  • খাদ্য ও আতিথেয়তা: অনেক সময়ই দেখা যায়, কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অন্য ধর্মের মানুষজন খাবার বিতরণের দায়িত্ব নিচ্ছেন বা আপ্যায়নে সাহায্য করছেন। এই সহযোগিতাগুলি সহমর্মিতা ও সংহতির বার্তা বহন করে।

​২. মানসিক স্বস্তি ও পর্যটনের প্রসার

​নিয়মিত জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দিতে উৎসবের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষ কেনাকাটা করে, ঘুরে বেড়ায় এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে মিলিত হয়। এই মানসিক স্বস্তি এবং সম্পর্কের পুনর্নবীকরণ সমাজের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।

​তাছাড়া, বড় উৎসবগুলি স্থানীয় পর্যটনকেও প্রভাবিত করে। বহিরাগতরা উৎসব দেখতে আসেন, যার ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও হস্তশিল্পের ব্যবসায় গতি আসে। এটি আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাজ্য পর্যটকদের কাছে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধর্মনিরপেক্ষ রূপটি তুলে ধরে।

​উপসংহার: মানবতার উৎসব

​ধর্মীয় উৎসবগুলি আমাদের সমাজের অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করে এবং মানবিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। এই উৎসবগুলি প্রমাণ করে যে, যখন প্রয়োজন হয়, তখন মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র প্রতিবেশী, ক্রেতা, বিক্রেতা বা সহকর্মী হিসেবে একে অপরের ওপর নির্ভর করে।

​এখানকার মূল বার্তাটি হলো: উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে ধর্মীয় বিশ্বাস থাকলেও, এর পরিধি ও সুবিধা সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ও কল্যাণমুখী। উৎসবের সময় এক রিকশা চালকের বেড়ে যাওয়া রোজগার, এক দর্জির হাতে অতিরিক্ত কাজ, অথবা রাস্তার ধারে ফুচকা বিক্রেতার মুখে হাসি—এই প্রতিটি দৃশ্যই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ঐক্যের ফল।

​আমাদের সকলের উচিত এই 'উৎসব অর্থনীতি'র গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং এটিকে একটি জাতীয় সম্পদ হিসেবে লালন করা, যা কেবল সংস্কৃতিকেই নয়, আমাদের সম্মিলিত জীবনযাত্রাকেও উন্নত করে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

২০২৫ সালে বাংলাদেশের সেরা ১০টি হিডেন ট্র্যাভেল স্পট – যা এখনো অনেকেই জানে না! 📅 প্রকাশকাল: ৮ জুন ২০২৫

ইরান ও ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ট্রাম্প বনাম মাস্ক: প্রযুক্তির টাইকুন ও রাজনীতির মহারথীর প্রকাশ্য দ্বৈরথ